ধর্ষণ সম্পর্কে প্রচলিত যত ভ্রান্ত ধারণা


এড়িয়ে যাবেন না। জানুন এবং জানান। প্রতিরোধ করুন ধর্ষণ সম্পর্কে এই ভ্রান্ত ধারণাগুলো যা উসকে দেয় এই ঘৃণিত অপরাধকে। আসুন, প্রতিরোধ করি এই জঘন্য অপরাধ।
ভ্রান্ত ধারণা-১
পোষাক পরিধানের ধরণ এবং আচার-আচরণের কারণেই কারণেই মূলত নারীরা যৌণ হয়রানির শিকার হয়। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের উপর এই দুর্দশা ডেকে আনে এবং কেবল মাত্র যুবতী নারীরাই ধর্ষণের শিকার হয়।
সত্য-
ধর্ষণ সম্পর্কে সবচাইতে বড় ভুল ধারণা হলো এটি। আর কিছুই নয়, কেবলই একজন নারীর ওপর ধর্ষণের দোষ চাপিয়ে দেয়ার নিচু একটি কৌশল এটি। ধর্ষণের সাথে নারীর বয়স বা পোশাকের কোনো সম্পর্ক নেই। সারা পৃথিবী জুড়েই সকল বয়সের, শ্রেণীর, সংস্কৃতির, ক্ষমতার, যৌণতার, জাতের এবং বিশ্বাসের নারী ও শিশুরা ধর্ষণের শিকার হয়। আকর্ষণের ভূমিকা এখানে গৌণ। ৩ বছরের একটি শিশুকন্যা যেমন ধর্ষিত হয়, ৪৫ বছরের মধ্যবয়স নারীও তেমনই ধর্ষিত হয়। এমনকি ধর্ষিত হয় আপাদমস্তক বোরখায় ঢাকা নারী এবং বালক বা কিশোররাও।
অনেক নারীই মনে করেন বয়স অথবা যৌবন শেষ হয়েছে বিধায় তিনি ধর্ষণের ঝুঁকি হতে মুক্ত। কিংবা ছোট ছেলেদের কোনো ভয় নেই ধর্ষণের। বাস্তবতা হলো এই পৃথিবীর বুকে তিরানব্বই বছরের নারীও ধর্ষণের স্বীকার হয়েছে, প্রতিদিন হচ্ছে ৫ থেকে ১২/১৫ বছরের ছোট ছেলেরাও। মেয়ে শিশু তো হচ্ছেই ধর্ষণ হলো একটি নির্যাতন মূলক অপরাধ, ধর্ষণ কখনই যৌনতা নয়। তাই নিজে সচেতন থাকুন, নিজের আশেপাশে সকলকে সচেতন রাখুন।
ভ্রান্ত ধারণা-২
সবাই জানে যখন কোন নারী ‘না' বলে সে আসলে ‘হ্যাঁ' বোঝাতে চায়। নারীরা গোপনে গোপনে ধর্ষিত হতেই চায়।
বাস্তবতা-
এটা আরেকটি খোঁড়া ও জঘন্য যুক্তি যা ধর্ষকেরা নিজেদের রক্ষায় দিয়ে থাকে। ধর্ষণ একটি অত্যন্ত ভীতিজনক, ভয়াবহ এবং অপমানজনক অভিজ্ঞতা যা কোনো নারীই প্রত্যাশা করেন না। আইন অনুযায়ী, যৌন মিলনের সময় যদি দুই সঙ্গীর যে কোনো একজন না বলে এবং অন্যজন তখন না থামে, তাহলে সেটাও যৌন হয়রানির শামিল। অর্থাৎ সম্মতি বিহীন যৌন মিলনই ধর্ষণ হিসাবে গণ্য আইনের চোখে। সেখানে জোর জবরদস্তির মাধ্যমে ধর্ষণ কীভাবে একজন নারীর বা শিশুর কাম্য হতে পারে কখনো ভেবে দেখেছেন?
ভ্রান্ত ধারণা-৩
নারী মাতাল ছিলো, নেশাদ্রব্য গ্রহণ করেছিলো, বাজে রেপুটেশন ছিলো, একা চলাফেরা করেছিলো, আঁটসাটো পোষাক পড়েছিলো, প্ররোচিত করেছিলো পুরুষটিকে। আসলে সে ধর্ষিতই হতে চেয়েছিল।
সত্য-
ধর্ষণের পর এইসব কথাই বলে থাকে ধর্ষক নিজেকে বাঁচানোর জন্য, ধর্ষিতার গায়েই সমস্ত দোষ ছুঁড়ে দেয়ার চেষ্টা করে। সত্যটা এই যে, একজন নারী মাতাল হলেও তাঁকে ধর্ষণের অধিকার কারো নেই। এমনকি সে দেহ ব্যবসায় নিয়োজিত থাকলেও তাঁকে ধর্ষণের অধিকার কারো নেই। আইন আমাদেরকে সেই অধিকার দেয় না। বিবেক আমাদেরকে সেই অধিকার দেয় না। যারা ধর্ষিতার "চরিত্র খারাপ" ছিল বলে ধোঁয়া তোলেন, তাঁরা একবার ভেবে দেখবেন যে কেবল চরিত্র খারাপ হয়াই যদি ধর্ষণের কারণ হয়ে থাকে, তাহলে ছোট শিশুরা কেন ধর্ষণের সশিকার হয়? তাঁদেরও কি চরিত্র খারাপ?
ভ্রান্ত ধারনা-৪
কেবল নারীরা ও মেয়ে শিশুরাই ধর্ষণের শিকার হয়, পুরুষেরা নিরাপদ।
সত্য-
এটা আরও ভয়ানক একটি ভুল ধারণা। ধর্ষণ কেবল নারী কিংবা মেয়ে শিশুদের হয় না, হয় পুরুষেরাও। পৃথিবীতে প্রতিদিন অসংখ্য বালক যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কিংবা সমকামীদের হাতে পুরুষেরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। এমনকি একজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী যদি একটি বালক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক টিনজারকে বাধ্য করে শারীরিকভাবে মিলিত হতে, তবে আইনের চোখে সেটাও ধর্ষণ। আপনি পুরুষ বলে নিজেকে নিরাপদ ভাবছেন? একদম ভাবতে যাবেন না! অস্ত্রের মুখে বিকৃত যৌন রুচির আরেক পুরুষ দ্বারা ধর্ষিত হতে পারেন আপনিও।
ভ্রান্ত ধারণা-৫
যে সকল পুরুষ ধর্ষণ করে কিংবা যৌন হয়রানী করে তারা মানসিক ভাবে অসুস্থ অথবা অমানুষ।
বাস্তবতা-
গবেষণায় দেখা গেছে মাত্র ৫% পুরুষ তাদের অপকর্মটি সংগঠনের সময় মানসিক বিকারগ্রস্থ থাকে এবং অল্পসংখ্যক ধর্ষককেই মানসিক চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করা হয়। বাকি সমস্ত পুরুষই ধর্ষণের কাজটি করেন অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় ও একদম সুস্থ অবস্থায়।
ভ্রান্ত ধারণা-৬
মাতাল, নেশাগ্রস্থ, হতাশ এবং অধিক চাপে থাকা পুরুষ মানুষ নিজের মাঝেই নিজে থাকে না। অস্থির হয়ে ধর্ষণ করে ফেলে ভুলে।
বাস্তবতা-
পুরুষরা ধর্ষণকে "জাস্টিফাই" করার জন্য নানা ধরণের অযুহাত দেয়। কিন্তু বাস্তবিকভাবে ধর্ষণের পেছনে কোন অযুহাতই থাকতে পারে না। একজন মানুষ মাতাল, নেশাগ্রস্থ বা মানসিক চাপে থাকলে ধর্ষণ করবে, এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। ধর্ষণ মানুষের সমস্যার সমাধান নয়।
ভ্রান্ত ধারণা-৭
একজন পুরুষ যৌন তাড়িত হলে নিজের উপর নিয়ন্ত্রন হারায়, তার যৌন সম্ভোগের প্রয়োজন হয়।
বাস্তবতা-
গবেষণায় দেখা গেছে অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত অর্থাৎ তারা হয় সম্পূর্ণ বা আংশিক পরিকল্পনা পূর্বেই করে ফেলে। তাছাড়া একের অধিক আক্রমনকারীর দ্বারা সংগঠিত ধর্ষণের ঘটনা সর্বদাই পরিকল্পিত হয়। পুরুষ মানুষ যৌণ মিলণের ইচ্ছা সহজেই নিয়ন্ত্রন করতে পারে এবং নিজেকে সন্তুষ্ট করার জন্য কোনো নারীকে ধর্ষণ করার প্রয়োজন তার নেই। ধর্ষণ একটি "এক্ট অব ভায়োলেন্স", যৌণ সন্তুষ্টির উপায় নয়। পুরুষ ধর্ষণ করে কিংবা যৌণ হয়রানি করে প্রভাব বিস্তার করতে, নিয়ন্ত্রন করতে এবং প্রতিহিংসামূলক আচরণ থেকে।
Loading...

No comments

Powered by Blogger.