ডাকাত যখন ধর্মযাজক


ছিলেন ডাকাত, এখন হয়েছেন ধর্মগুরু। মদপান ও বেচাকেনা ছিল যার নেশা। এখন তিনি ধর্মপ্রচারক। তার মদের বারটিই এখন প্রার্থনা কক্ষ। তার নাম তাতসুয়া সিন্দো।ডাকাত সিন্দো নামেই বেশি পরিচিত এ জাপানি। মদের ব্যবসা ছেড়ে এখন পুরোদস্তুর ধর্মগুরু তিনি।
জাপানের রাজধানী টোকিওর একটি ছোট্ট শহর কাওয়াগুচি। শহরের এক প্রান্তের একটি বারের দরজায় লেখা ‘জুন ব্রাইড’। পঁচিশ বছর ধরে এ অঞ্চলের অধিবাসীর কাছে নিরিবিলি কাটানোর এটাই একমাত্র স্থান।
দীর্ঘদিনের পরিচিত বারটির বাইরের চেহারায় সামান্য পরিবর্তন এলেও এর ভেতরে এসেছে আমূল পরিবর্তন। বার ও মঞ্চের জায়গায় এখন ভিন্নধর্মী আসবাবপত্র। কারণ জুন ব্রাইড আর এখন মদ বিক্রির দোকান নয়, এটি বর্তমানে একটি উপাসনালয়।
জুন ব্রাইডের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকেই সেনসি তাতসুয়া সিন্দো দু’হাত তুলে সবার জন্য প্রার্থনা করেন- এমন দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। ৪৪ বছরের সিন্দোকে দেখলে এখনও তরুণ মনে হয়।
তার লম্বা চুল আর ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি সবার হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেয়। সিন্দোর চারপাশে এখন যারা ভিড় করে ধর্মকথা শুনছেন তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাদের সঙ্গে অতীত জীবনে সিন্দোর শত্রুতার সম্পর্ক ছিল।
অথচ এখন তারা মিলেমিশে ঈশ্বরের প্রার্থনা করছেন। সিন্দোর ভাষায়, ‘আগে আমরা প্রতিপক্ষ গ্যাংয়ের ছিলাম। আর এখন আমরা একই ঈশ্বরের প্রার্থনা করি।’
জাপানের অধিকাংশ তরুণের মতোই মাত্র ১৭ বছর বয়সে মাফিয়া গ্যাং ইয়াকুজাতে যোগ দিয়েছিলেন সিন্দো। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, প্রতি বছর দশ হাজারেরও বেশি জাপানি তরুণ ইয়াকুজাতে যোগ দেয়।
সিন্দোর মতে, কম বয়সী তরুণদের অধিকাংশই আসে ঝামেলাপূর্ণ পরিবারগুলো থেকে। আনুগত্য আর বিশ্বাস হল ইয়াকুজা পরিবারের অন্যতম অস্ত্র। কিন্তু সিন্দো যতই এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভেতরে প্রবেশ করতে লাগলেন ততই বুঝতে পারলেন রক্তের মূল্য কতটা।
সিন্দো জানান তার খারাপ অনুভূতির কথা। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে আমার বসকে হত্যা করা হয়েছিল। মানুষের পায়ে গুলি করে অকেজো করে দেয়া হয়।
আমার সঙ্গেই যে মানুষটি মাদক সেবন করত, সে বিষক্রিয়ায় মারা যায়। আত্মহত্যাও হচ্ছে। অনেক মৃত্যু দেখেছি আমি। যে মানুষটি অন্যকে হত্যার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছিল তাকেও ছুরিকাঘাতে মরতে দেখেছি।’
সিন্দোর পুরো শরীরে তার অতীত জীবনের স্মৃতিচিহ্ন আজও রয়ে গেছে। তার বুক ও হাত দুটো ভারি ট্যাটু দিয়ে ভর্তি। জাপানে মাফিয়াদের সদস্য হলে এমন ট্যাটু এঁকে দেয়া হয়। এই ট্যাটু লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা হয়।
কিন্তু যখন অন্য গ্যাংয়ের সঙ্গে লড়াই বাঁধে তখন সবাই তাদের গায়ের পোশাক খুলে ফেলেন। মোট সাতবার গ্রেপ্তার হন সিন্দো। বয়স ২২ হওয়ার আগেই তিনি তিনবার কারাবরণ করেন।
৩২ বছর বয়স আসতে আসতে জীবনের প্রায় দশ বছর কারাগারে কাটিয়ে দেয়ার পর ইয়াকুজার আরও ভেতরে চলে যান তিনি। কিন্তু কারাগারে থাকার সময়ে তার মধ্যে আমূল পরিবর্তন আসে।
সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি মাফিয়া জগৎকে চিরদিনের জন্য বিদায় জানান। একজন ধর্মগুরু বা ধর্মযাজক হিসেবে জীবন অতিবাহিত করার সিদ্ধান্ত নেন।
জাপানে সিন্দোর মতো আরও অনেকেই আছেন যারা একজীবনে প্রচণ্ড দৌড়ঝাঁপের জীবন অতিবাহিত করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চাইলে তাকে হয় হত্যা করা হয়েছে নতুবা গোটা জীবনের জন্য শারীরিকভাবে অকেজো করে দেয়া হয়।
খুব কম সংখ্যক তরুণই আছেন যারা মাফিয়াদের ছেড়ে দেয়ার পরও অক্ষত থাকেন। অবশ্য সিন্দোর ক্ষেত্রে এরকম ঝামেলা হয়নি। কারণ ইয়াকুজায় একদিকে সিন্দোকে যেমন সবাই ভয় পেত, তেমনি সম্মানের চোখেও দেখত।
Loading...

No comments

Powered by Blogger.