নারীদের একাকি ভ্রমণের জন্য নিরাপদ ১০ দেশ


নারীদের জন্য একা ঘুরতে যাওয়ার ব্যাপরটাকে এখনও আমাদের সমাজে ট্যাবু ও অনিরাপদ বিষয় হিসেবে রাখা হয়েছে। তা সে যে কোন বয়সের নারীই হোক। হোক সে বিবিহিত কিংবা অবিবাহিত, স্বালম্বী কিংবা পরনির্ভরশীল। যদি কেউ একা ভ্রমণে যায় তাহলে তাকে অবশ্যই সেই দিনই বাড়ি ফিরে আসতে হবে। কারণ নিরাপত্তা। নারীরা এখনও বিশ্বের কোথাও শতভাগ নিরাপদ না। হোক সেটা উন্নত বিশ্ব কিংবা তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশ। কোথাও নারীর নিরাপত্তা নেই। এ কারণে বিশ্বে নারী পর্যটকের সংখ্যা নেহায়েতই কম। তবে এমন কয়েকটি দেশ রয়েছে যেখানে নারীদের ভ্রমণ শতভাগ নিরাপদ না হলেও নারীরা একাকি স্বাচ্ছন্দে ভ্রমণ করতে পারেন। বিশ্বে নারীদের ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ১০টি দেশ নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন_
১) ফিনল্যান্ড

ফিনল্যান্ডকে বলা হয় ‘মধ্যরাতের সূর্যের দেশ’। ইউরোপের বাল্টিক সাগরের উপকূলে অবস্থিত ফিনল্যান্ড প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য আদর্শ গন্তব্য। এখানে ঘন সবুজ অরণ্য ও প্রচুর হৃদ রয়েছে। ইউরোপের বৃহত্তম ঘন অরণ্য লেমেনজোকি ন্যাশনাল পার্ক এখানে অবস্থিত। ফিনল্যান্ডের মেরু অঞ্চলে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রায় সবসময় দিন থাকে। এই জন্য একে ‘মধ্যরাতের সূর্যের দেশ’ বলা হয়। এই দিনগুলিতে ফিনল্যান্ডের নয়নাভিরাম উপকূলীয় এলঅকাগুলোতে হাজার হাজার পর্যটক নৌকা নিয়ে বেড়াতে আসে।
সুরক্ষা: ফিনল্যান্ড ভ্রমণ ও পর্যটনের ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদনে সুরক্ষার দিক থেকে বিশ্বের এক নম্বরে রয়েছে। নারীদের একা ভ্রমণ করার জন্য ইউরোপের অন্যতম নিরাপদ দেশ ফিনল্যান্ড, এবং মহিলাদের একা ভ্রমণের জন্য অন্যতম নিরাপদ দেশ।
২) কানাডা
কানাডা উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত একটি দেশ। আয়তনের দিক থেকে এটা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। পূর্বে আটলান্টিক ও পশ্চিমে প্যাসিফিক এই দুটি মহাসাগর থেকে শুরু করে পশ্চিমের বিস্তির্ণ পাহাড়ী এলাকাসহ আরো বহু কিছুই আছে দেশটিতে দেখার। আছে নদী, আছে সুবিশাল বন। অন্টারিওর উত্তরে আছে হাডসন উপসাগর। চার ঋতুতে কানাডার রূপ বদলায় চার রকম। তীব্র শীত থেকে তীব্র গরম সবই অনুভব করা যায় এখানে।
পশ্চিমের সুদর্শন শহর ভেঙ্কুভার, মন্ট্রিয়লের ওল্ড সিটি, কুইবেকের রাজধানী কুইবেক সিটিসহ অন্যান্য শহরগুলোর প্রত্যেকটির রয়েছে আলাদা আলাদা বৈচিত্র। কানাডার নাগরিকেরা বন্ধুবৎসল। দেশটিতে রয়েছে নিরাপত্তার গ্যারান্টি। সুতরাং নির্ভয়ে বেড়াতে যেতে পারেন দেশটির যে কোন প্রান্তে।
কানাডায় কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা মনে হলে প্রথমেই আসে নায়েগ্রা ফসল এর কথা। কানাডায় এবং পৃথিবীতেও সবচেয়ে বিখ্যাত কয়েকটি প্রাকৃতিক আকর্ষনীয় স্থানের মধ্যে এই নায়েগ্রা ফসল অন্যতম। কেউ কানাডায় বেড়াতে আসলেন আর নায়েগ্রা ফসল দেখতে গেলেন না এটি হতেই পারে না। নায়েগ্রা ফলস না দেখলে কানাডা দেখা হয় না। প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন পর্যটক আসেন কানাডায় শুধু এই ফলসটি দেখার জন্য।
সুরক্ষা: আমেরিকা অঞ্চলের দেশগুলির মধ্যে কানাডা নারী ভ্রমণকারীদের জন্য ৱসবচেয়ে নিরাপদ গন্তব্য হিসাবে বিবেচিত হয়। নারীদের একা ভ্রমণের জন্য বিশ্বের অনেক নিরাপদ শহর কানাডায় রয়েছে।
৩) নিউজিল্যান্ড
‘লর্ড অফ দ্য রিং’ সিনেমার ভক্তদের জন্য প্রাকৃতিক দৃশ্যের অন্য এক জগত এই নিউজিল্যান্ড। যারা অ্যাডভেঞ্চার, খেলাধুলা, প্রকৃতি পছন্দ করেন তাদের জন্য আদর্শ গন্তব্য। এই ছোট দেশটি দুটি প্রধান দ্বীপ নিয়ে গঠিত, যা অত্যন্ত বিচিত্র ধরণের প্রাকৃতিক দৃশ্যে ভরপুর। উত্তর দ্বীপে আপনি স্বর্গের সৈকত, সক্রিয় আগ্নেয়গিরি এবং রঙিন হ্রদ পাবেন। দক্ষিণ দ্বীপে আবার বেশ আলাদা দৃশ্য, বরফের শিতল পানি, হিমবাহ এবং সীল ও তিমি দ্বারা ভরপুর খোলা সমুদ্র দেখে মুগ্ধ হয়ে যাবেন।
সুরক্ষা: ইনিস্টিটিউট ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নিউজিল্যান্ড ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ড বিশ্বের চতুর্থ নিরাপদ দেশ হিসাবে বিবেচিত হয়। কিছু রিপোর্ট নিউজিল্যান্ডকে বিশ্বের নারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ দেশ হিসাবে বিবেচনা করে। নিঃসন্দেহে নারীদের একাকি ভ্রমণের জন্য বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ দেশ নিউজিল্যান্ড এটি কোন সংশয় ছাড়াই বলা যায়।
৪) উরুগুয়ে
ব্রাজিলের ঠিক পাশেই অবস্থিত দক্ষিণ আমেরিকার এই ছোট্ট দেশটি ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর জায়গা। এর রাজধানী মন্টেভিডিওতে আপনি সৈকত উপভোগ করতে পারেন যা শহরের নগর অংশের সাথে এক বিস্ময়কর বৈপরীত্য তৈরি করে। উরুগুয়ের সর্বাধিক বিখ্যাত রিসোর্ট শহর পান্তা দেল এস্তে, এখানে আপনি সমুদ্র সৈকত, স্মৃতিস্তম্ভ এবং বিশ্রামের জন্য মনোরম শান্ত জায়গা পাবেন। কলোনিয়া দেল স্যাক্রামেন্টোতে, আপনি ইতিহাস এবং মোহনীয়তায় পূর্ণ একটি ছোট অঞ্চল দেখার সুযোগ পাবেন।
সুরক্ষা: আমেরিকাতে সবচেয়ে কম অপরাধের হার রয়েছে উরুগুয়েতে। দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক নারীদের জন্য উরুগুয়ে এই অঞ্চলের অন্যতম নিরাপদ দেশ।
৫) সুইজারল্যান্ড
ইউরোপের কেন্দ্রে অবস্থিত সুইজারল্যান্ড ভ্রমণ প্রিয় মানুষদের জন্য দুর্দান্ত এক গন্তব্য। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, বিভিন্ন ধরণের সুন্দর আকর্ষণীয় এবং কসমোপলিটান প্রাকৃতিক দৃশ্যে পরিপূর্ণ একটি দেশ সুইজারল্যান্ড, যা আপনার মনকে প্রশান্ত করে দেবে। ছবির মতো সুন্দর এই দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে পাগল করে দেবে।
সুরক্ষা: গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই) অনুযায়ী সুইজারল্যান্ড বিশ্বের সপ্তম শান্তিপূর্ণ দেশ। এই দেশটি নারীদের জন্য একটি অবিশ্বাস্যভাবে নিরাপদ দেশ। নারীরা কোন সংশয় ছাড়াই একাই বেরিয়ে পড়তের পারন ইউরোপের অন্যতম নিরাপদ এই দেশটিতে ভ্রমণের জন্য।
৬) বেলজিয়াম
ইউরোপের অন্যতম শান্তি প্রিয় ও নিরাপদ দেশ বেলজিয়াম। ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য বেলজিয়াম ইউরোপের আদর্শ গন্তব্য হিসাবে পরিচিত। দেশটিতে অনেকগুলি ঐতিহাসিক স্থান, দুর্দান্ত অবকাঠামো এবং অন্যান্য বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। ব্রাসেলসের রাস্তায় ঘুরেতে ঘুরতে আপনি মধ্যযুগীয় স্থাপত্য উপভোগ করতে পারবেন। চারদিকে ছবির মত সুন্দর ঘরবাড়ি, যেদিকে তাকাবেন প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়ে রেখেছে বেলজিয়ামকে। অত্যান্ত সচেতন ও সুশৃঙ্খল জাতি এরা।
সুরক্ষা: একা ভ্রমণকারী নারীদের জন্য সেরা দেশগুলির অন্যতম বেলজিয়াম। আন্তর্জাতিক মহিলা ট্র্যাভেল সেন্টারের তালিকায় বেলজিয়াম দশম স্থানে রয়েছে। বেলজিয়াম অল্পবয়সী মেয়েদের একাকি ভ্রমণের জন্য একটি দুর্দান্ত গন্তব্য। নিরাপত্তা নিয়ে এখানে কোন চিন্তা নেই।
৭) অস্ট্রিয়া
অনেক ভ্রমণকারীদের কাছে অস্ট্রিয়া একটি প্রায় নিখুঁত দেশ। তারা বলেছে যে সমস্যাগুলি সেখানে অদৃশ্য হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। যার কারণ অবশ্যই অস্ট্রিয়ানরা ইউরোপের কিছু সেরা মানের জীবন উপভোগ করতে পারে। দেশটিতে সত্যিই কিছু অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য রয়েছে, যা আপনাকে মুগ্ধ করবেই। স্নো-ক্যাপড পর্বতশৃঙ্গ, সুন্দর সবুজ বন এবং স্ফটিক-স্বচ্ছ হ্রদ পাবেন দেশটিতে।
সুরক্ষা: একা ভ্রমণকারী নারীদের জন্য সেরা দেশগুলির আরেকটি অস্ট্রিয়া। আন্তর্জাতিক মহিলা ট্র্যাভেল সেন্টারের তালিকায় অস্ট্রিয়া চতুর্থ স্থানে রয়েছে। নারীদের একা ভ্রমণ করার জন্য ইউরোপের অন্যতম নিরাপদ দেশ অস্ট্রিয়া।
৮) আইসল্যান্ড
দেশটির জন্য ‘আইসল্যান্ড’ নামটি সত্যিই উপযুক্ত, কারণ দেশটির ১৫ শতাংশ এলাকা বরফ দিয়ে আচ্ছাদিত। আপনি সেখানে বরফের উপর হাঁটতে পারবেন, বরফের গুহা আবিষ্কার করতে পারেন। তবে এত বরফ সত্ত্বেও দেশটি প্রচুর আগুন লাগার ঘটনা আছে। এখানে ২০টিরও বেশি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। যার ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটে। বরফ এবং আগুনের মধ্যে আইসল্যান্ড তার ভ্রমণকারিদের জন্য সত্যই দুর্দান্ত দর্শনীয় সব স্থান অফার করে। এর রাজধানী রেইকাজাভিক অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি শহর।
সুরক্ষা: পৃথিবীর সবচেয়ে কম অপরাধের হার রয়েছে আইসল্যান্ডে। গ্লোবাল পিস ইনডেক্সে (জিপিআই) এক নম্বরে রয়েছে দেশটি। আইসল্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ভ্রমণের সন্ধানে চলা নারীদের অন্যতম সেরা গন্তব্য।
৯) জাপান
জাপান এমন এক গন্তব্য যেখানে সহস্রাব্দ-প্রাচীন ঐতিহ্যগুলির পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তির সাথে সহাবস্থান দেখার সুযোগ মেলে। যান্ত্রিক নগরী টোকিওর পাশাপাশি এখানে রয়েছে মাউন্ট ফুজির মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার সুযোগ।
সুরক্ষা: গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই) অনুযায়ী জাপান বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশগুলির মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে। একাকি নারী ভ্রমণকারীদের জন্য জাপান বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ স্থান।
১০) চিলি
চিলি এমন এক অনন্য সৌন্দর্যের দেশ যা ভ্রমণকারীদের বিমোহিত করে তোলে। চিলি চলচ্চিত্র শুটিংয়ের জন্য উপযুক্ত প্রাকৃতিক দৃশ্যে পরিপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের সর্বাধিক শুষ্ক মরুভূমি অ্যাটাকামা এবং পাতাগোনিয়ার বুনো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। চিলিতে রয়েছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক শহর, প্রাণবন্ত সৈকত এবং নিখুঁত প্রাকৃতিক নৈসর্গ। দেশটির রাজধানী সান্তিয়াগো পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত আকর্ষণীয় একটি শহর।
সুরক্ষা: চিলির অপরাধের হার অত্যন্ত কম। গ্লোবাল পিস ইনডেক্সে চতুর্থ স্থানে রয়েছে দেশটি। নারী হিসেবে একাকি চিলি ভ্রমণ সম্পূর্ণ নিরাপদ।
Loading...

No comments

Powered by Blogger.