গুরুনানকের একাল-সেকাল


শিখ ধর্মের প্রবর্তক এবং সেই ধর্মের প্রথম গুরু, নানক দেবের জন্ম হয় ১৫ই এপ্রিল, ১৪৬৯ সালে কার্তিক পূর্নিমা তিথিতে বর্তমান পাকিস্তানের রাজধানী লাহৌরের একটি ছোট গ্রাম তালবন্দীতে | বর্তমানে সেই স্থানটি আজ পাকিস্তানে, নানকানা সাহিব নামে পরিচিত |
গুরু নানকের বাবার নাম ছিল, কল্যাণ চন্দ দাস বেদী ওরফে মেহেতা কালু এবং মায়ের নাম ছিল তৃপ্তা দেবী | তাঁর বাবা মেহেতা কালু ছিলেন সেখানকার একজন মুসলিম জমিদারের সাধারন হিসাবরক্ষক |

নানকজীর পরিবার চার সদস্যের ছিলো অর্থাৎ সেখানে তিনি, তাঁর বাবা-মা এবং তাঁর বড় দিদি বিবি নানাকী একসাথে থাকতেন |

বিবি নানাকী, নানকজীর থেকে ৫ বছরের বড় ছিলেন | ১৪৭৫ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পাঞ্জাব প্রদেশের সুলতানপুরে চলে আসেন |

অনেকের মুখে শোনা যায় নানকজী তাঁর দিদিকে এত স্নেহ করতেন যে, দিদির বিয়ের পর তিনি সুলতানপুরে চলে আসেন দিদি ও জামাইবাবুর সাথে থাকতে |

শোনা যায়, নানকজীর নাকি ছোটবেলা থেকেই আধ্যাত্বিক বিষয়ে গভীর আগ্রহ ছিল | তিনি সর্বদা ঈশ্বর আরাধনায় লেগে থাকতেন | তো সেই দেখে, তাঁর বাবা-মা গভীর চিন্তায় পরেন |

তিনি প্রায়শই নির্জনে গিয়ে ধ্যানস্ত হতেন, এবং তাঁর গ্রামে যদি কোনো সাধু-সন্তরা আসতো তাহলে তিনি তাদের কাছে গিয়ে বিভিন্ন ধর্মকথা একদম মন দিয়ে শুনতেন |

এবার তাঁর বাবা সেইসব দেখে অবশষে তাঁর ছেলেকে সংসারী করার পিছনে উঠে পরে লাগলেন | কিন্তু ছেলেকে সংসারী করার আগে তাকে যে সর্বপ্রথম সামর্থবান করা প্রয়োজন সেটি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন |

তাইতো তিনি তাঁকে ফারসি ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যে গ্রামের একটি মুসলিম বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন  তাঁকে ফারসি ভাষা শেখানোর পিছনে তাঁর বাবার একটাই উদ্দেশ্য ছিল যাতে তাঁর ছেলে কোনো মুসলিম জমিদারের সেরেস্তায় কাজটা পেয়ে যায় |

কিন্তু নানকজী স্কুলে তো ভর্তি হলেন ঠিকই কিন্তু সেখানে তাঁর আর ফারসি শেখা হলোনা কারণ সেখানে গিয়েও তিনি খালি ধর্মকথা শুনতে চাইতেন |

অবশেষে তাঁর বাবা মেহেতা কালু, অনেক প্রচেষ্টার পর তাঁকে দৌলত খান লোধির অধীনে কাজে পাঠাতে সক্ষম হলেন |

দেখতে দেখতে খুব তাড়াতাড়ি গুরু নানকজীর বিয়ের ব্যবস্থা করা হয় এরপর | সুলক্ষনী নামের একটি মেয়ের সাথে তিনি অবশেষে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধও হন |

গুরু নানক খুবই দয়ালু ছিলেন, গরিব-দুঃখী দেখলেই তাঁর মন দুঃখে একদম ভরে যেত | তিনি যখন যা পারতেন সামর্থ অনুযায়ী সকলের সেবা করতেন এবং নিজের মাইনের বেশিরভাগ টাকাই তিনি সেইসব মানুষদের প্রতি বিলিয়ে দিতেন |

আসলে তিনি কোনদিনও নিজেকে সাংসারিক গন্ডির ভিতর আবদ্ধ রাখতে চাননি | সব সময় তাঁর মন সমাজের অবহেলিত, নিপীড়িত মানুষদের জন্য উদার থাকতো | তাদের সাহায্য ও কল্যাণই ছিলো তাঁর জীবনের আসল উদ্দেশ্য |তো এইভাবেই একদিন নানকজী দৌলত খান লোধির গুদাম ঘর দেখাশোনার দায়ীত্ব ছেড়ে দিলেন এবং নিজে ঈশ্বর আরাধনায় মননিবেশ করলেন |

সেইসময় তাঁর নাম, সেই গ্রাম তথা আশেপাশের গ্রামে বেশ ছড়িয়ে পড়েছিল | দূর দূর থেকে মানুষ তাঁর সাক্ষাত পাওয়ার জন্য আসতেন |নানকজী কিন্তু জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে নিজের কাছে টেনে নিতেন, তাঁর কাছে সবাই ছিল সমান |  তিনি কিন্তু এক ওঙ্কার অর্থাৎ এক ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন | মূর্তি পূজা বা একাধিক ঈশ্বরবাদে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না |

ধনী দরিদ্র প্রত্যেকে এসে তাঁর কাছ থেকে জীবনের অমূল্য শিক্ষাগুলি নিয়ে যেত, এবং এরফলে তাদের প্রত্যেকের জীবন নানকজীর কৃপায় ধন্য হয়েও উঠেছিল |

তিনি তাঁর অনুগামীদের, জীবন ও ঈশ্বর কেন্দ্রিক কিছু বিশেষ উপদেশ দিতেন, যা আজও আমাদের প্রত্যেকের কাছে অমূল্য রত্নের ন্যায় সমান হতে পারে |


Loading...

No comments

Powered by Blogger.