মাটি ছাড়াই চাষাবাদ মহাকাশে


বিজ্ঞানীরা এখন নিশ্চিত, মহাকাশের পরিবেশে হাইড্রোপনিক্সই (মাটি ছাড়া চাষ) হবে খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাই আগামীদিনগুলোতে নভোযাত্রী বা অন্য কোনো গ্রহে উপনিবেশ স্থাপনকারীদের মহাকাশে টিকে থাকার অন্যতম উপায় বিবেচিত হবে মাটিছাড়া চাষ পদ্ধতি। কারণ হিসেবে নাসার বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবী থেকে মহাকাশে মাটি নিয়ে চাষবাস করা মোটেও লাভজনক প্রমাণিত হবে না। তাই মহাকাশে হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিই সবচেয়ে বেশি উপযোগী।
তারা বলেন, হাজার হাজার মাইলের মহাকাশ যাত্রায় নভোযানের ভিতরেই প্রাণধারণের উপযোগী চাষবাস সম্ভব। এতে নভোচারীরা যেমন তাজা শাকসবজি খেতে পারবেন, তেমনি এসব উদ্ভিদ নভোযানের ভিতরের কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের পর অক্সিজেন ত্যাগ করে নভোযানের ভিতরের পরিবেশ নভোচারীদের প্রাণধারণের উপযোগী রাখবে। বিজ্ঞানীদের উত্সাহের আসল কারণ হচ্ছে, তারা এটা নিশ্চিত হতে পেরেছেন, মহাকাশে চাষবাসের ‘প্রাথমিক বাধা’ মানুষ ডিঙাতে পারবে। কারণ পৃথিবীতে বীজের অঙ্কুরোদ্গম যেভাবে ঘটে, মহাকাশেও ঠিক সেভাবে ঘটবে। এমনকি কোনো ধরনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি না থাকার পরও। তারা প্রমাণ পেয়েছেন, পৃথিবীতে গাছের মূল তার চলার পথে পাথর বা অন্য কোনো বাধা পেলে দিক পরিবর্তন করে। মহাকাশেও গাছের মূল একই আচরণ করে।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে জন্মানো নানা প্রজাতির গাছের বেড়ে ওঠার ওপর গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন। বিষয়টি নিয়ে কেনেডি স্পেস সেন্টারের বিশেষায়িত চেম্বারেও নানা মাত্রায় গবেষণা চলছে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নানা গবেষণায় দায়িত্বপালনরত নভোচারীদের জন্য পৃথিবী থেকে খাবার পাঠাতে বিপুল পরিমাণ খরচ হয়। আর এ খরচ কমাতে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা মহাকাশে সবজি চাষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৩০ মাইল ওপরে তৈরি হবে এ সবজি বাগান। সেখানে তারা প্রাথমিকভাবে ছয় প্রজাতির ‘লেটুস পাতা’ চাষ করবে। ইতিমধ্যে মহাকাশ স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে চারা গাছ লাগিয়ে সফলতা মিলেছে। মহাকাশে উত্পাদিত সবজি ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ও পরিষ্কার হবে বলেও বিজ্ঞানীরা আশা করছেন। উল্লেখ্য, পৃথিবী থেকে মহাকাশচারীদের জন্য মহাকাশ স্টেশনে এক পাউন্ড খাবার পাঠাতে ১০ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি খরচ হয়।
বর্তমানে মহাকাশে একমাত্র বাগানটি করা হয়েছে স্টেশনের ভিতরেই এবং অনেক ছোট্ট পরিসরে।
বলা হচ্ছে, মঙ্গলে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে যারা যাবেন তাদের নভোচারী-কৃষক বলাই যৌক্তিক। কারণ যে কোনো জায়গায় স্থায়ী আবাস গড়ার অন্যতম জরুরি বিষয় হলো খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। অথচ খাদ্য সব সময় পৃথিবী থেকে মঙ্গলে নেয়া সম্ভব নয়। তাই সমাধান একটাই— মঙ্গলে চাষবাস করা, কৃষিকাজ করা। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মঙ্গলে পৃথিবীর প্রথম অ্যাম্বাসেডর হিসেবে পরিচিত আগামীদিনের নভোচারী-কৃষকরা পৃথিবীর কৃষকদের চেয়ে ঢের বেশি পরিশ্রমী হবেন, পরিশ্রমী হতে বাধ্য হবেন। কিন্তু এটা মৌলিক সমস্যা নয়।
নাসা উঠেপড়ে লেগেছে মঙ্গলে চাষবাসের সঠিক পদ্ধতি বের করতে। কেননা ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের মনুষ্যবাহী মঙ্গল মিশনে যাওয়ার কথা রয়েছে। চাষবাসের ব্যাপারটা নাসা কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, সে ব্যাপারে নাসার হিউম্যান এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড অপারেশন্স মিশন ডিরেক্টরেটের সহযোগী প্রশাসক বিল জারস্টেইনমেয়ার বলেন, ‘আমাদের ভেবে দেখা উচিত আমরা মঙ্গলে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য মানুষ পাঠাব কি না। আমার মনে হয় এটাই এখন আলোচনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
’ মঙ্গলে চাষবাস নিয়ে এখনও বেশ জটিলতার মধ্যে আছেন বিজ্ঞানীরা। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানতে পেরেছেন, মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে চাষবাস সম্ভব। কিন্তু তারা এখনও জানেন না মঙ্গলের কম গ্র্যাভিটি ওই গ্রহে পৃথিবীর খাদ্যশস্য চাষবাসে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে। আর তাছাড়া পৃথিবীতে আমরা সূর্যের আলো যতটা পাই, মঙ্গলপৃষ্ঠে পাওয়া যাবে তার অর্ধেক। কাজেই চাষবাস করতে ওখানে বাড়তি আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। আর এই ব্যবস্থা করতে দরকার পড়বে বিশাল পরিমাণ শক্তি। তবে আশার আলো দেখিয়েছেন নাসার হিউম্যান এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড অপারেশন্স মিশন ডিরেক্টরেটের লাইফ অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্স বিভাগের পরিচালক ড. মার্শাল পোর্টারফিল্ড। তিনি বলেন, ‘সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং বলে এটা বড় কোনো সমস্যা নয়। নাসা ইতিমধ্যেই এলইডি লাইটিংয়ের মাধ্যমে বৃক্ষকে তার যতটা প্রয়োজন ততটা তরঙ্গদৈর্ঘ্য দেয়ার ব্যাপারে গবেষণা করছে।
’ গবেষকরা দেখছেন পৃথিবীতে যতটা চাপ সহ্য করে বৃক্ষরা বেড়ে ওঠে মঙ্গলে তার চেয়ে কম চাপে বেড়ে উঠতে পারে কি না। এ ব্যাপারে ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারডিসিপ্লিনারি সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি রিসার্চের পরিচালক রবার্ট ফেরল বলেন, ‘বৃক্ষের যথার্থ বৃদ্ধির জন্য গ্রিনহাউসের চাপকে পৃথিবীর বায়ুচাপের মতো করে ফেলার দরকার নেই একদম। পৃথিবীর বায়ুচাপের ১০ ভাগের ১ ভাগ চাপেও বৃক্ষ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
’ মঙ্গলের বাসিন্দাদের ক্ষতিকারক রশ্মির ব্যাপারেও সাবধান থাকতে হবে। এ ব্যাপারেও ভাবতে হবে বিজ্ঞানীদের। কেননা পৃথিবীর মতো সুরক্ষামূলক কোনো বায়ুমণ্ডল নেই ওই লাল গ্রহের। তবে শত বাধা, শত চ্যালেঞ্জকে উপেক্ষা করে বিজ্ঞানীরা এখন অবধি দৃঢ়চিত্তে বলছেন, যে করেই হোক মঙ্গলে চাষবাস করার সর্বোত্তম পদ্ধতিটা তারা বের করেই ছাড়বেন।
আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে রবার্ট ফেরল বলেন, ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় মাইগ্রেশন তখনই সফল হয়েছে, যখন মানুষ তার কৃষিজ যন্ত্রপাতি সঙ্গে নিয়ে গেছে। সঙ্গে বৃক্ষ থাকলে আপনি কেবল কোনো জায়গা বেড়াতে যেতে পারবেন না, বরং সেখানে স্থায়ী আবাসও গাড়তে পারবেন নিশ্চিন্তে।’ তবে বিজ্ঞানীরা এটা মেনে নিয়েছেন, মহাকাশে চাষবাসের জ্ঞাত সমাধান কিন্তু হাইড্রোপনিক্সে।


Loading...

No comments

Powered by Blogger.