সত্য , ন্যায়ের সংগ্রামে গান্ধীজি



মহাত্মা গান্ধী ছিলেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনের শীর্ষ নেতা। আরও বহু বড় বড় হিন্দু ও মুসলমান নেতা ছিলেন, তাদের ভূমিকা কিছুমাত্র কম নয়; কিন্তু গান্ধীজি ছিলেন সবার ওপরে এবং সবার থেকে আলাদা। শুধু রাজনৈতিক নেতা বলতে যা বোঝায় তিনি তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের বন্ধু। ফরাসি মনীষী রঁমা রোঁলা ঠিকই বলেছেন, তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ, রাজনীতিক হন দায়ে পড়েই। তিনি ছিলেন মহান মানবতাবাদী নেতা ও সংস্কারক, যার লক্ষ্য ছিল সমাজে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা। শান্তির দূত হিসেবে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন সক্রিয়। তিনি ছিলেন একজন মহান দার্শনিক। কিন্তু প্রথাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মহীন দার্শনিকদের মতো শুধু চিন্তা ও বিচার-বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা দর্শনতত্ত্ববিদ তিনি ছিলেন না। তাই ১৯৪৭-এ কলকাতা থেকে শেষবার চলে যাওয়ার আগে তিনি এক ভক্তকে অটোগ্রাফ দিয়ে লিখেছিলেন :  My life is my philosophy.গান্ধীজির জীবনের মূল মন্ত্র ছিল সত্য (Truth) ও অহিংসা  (Non-violence)।

১৮৬৯ সালে তার জন্ম, তার সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামের শুরু দক্ষিণ আফ্রিকায় উনিশ শতকের শেষ দশকে। দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ সরকারের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে গান্ধীজি যে অহিংস সত্যাগ্রহ শুরু করেন এবং নির্যাতিত হন, পৃথিবীর ইতিহাসে তার তুলনা নেই। কুড়ি শতকের শুরু থেকে তিনি কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি অন্যান্য বিখ্যাত কংগ্রেস নেতার মতো ছিলেন না। তাঁর জীবনযাপনে ছিল সীমাহীন সারল্য। তাই শতাব্দীর শুরুতে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস সম্মেলনে তাঁকে মলমূত্র সাফাইয়ের কাজ করতে দেখা যায়। তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে, রাজনীতি করে উঁচু পদ পাওয়ার আশায় নয়।

গান্ধীর রাজনীতির লক্ষ্য ছিল সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা। চেয়েছেন রাজনীতি ও সমাজে অহিংসার নীতি প্রয়োগ। এক পর্যায়ে তিনি দলীয় রাজনীতির ঊধর্ে্ব উঠে যান। বরং বলা ভালো, দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণ গণ্ডিতে তিনি আবদ্ধ থাকতে চাননি। তাই ১৯৩৪-এর কংগ্রেসের বোম্বাই অধিবেশনে তিনি ঘোষণা দেন, 'আমি আমার অহিংসার নীতিতে অবিচল থাকার লক্ষ্যে কংগ্রেসের চার আনার সদস্যও আমি থাকতে চাই না।' এক পর্যায়ে তিনি তা ছিলেনও না, তবে তিনিই ছিলেন কংগ্রেসের পিতৃপ্রতিম শীর্ষ নেতা :সকল নেতার 'বাপু', 'বাপুজি'।

গান্ধীজি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই বহুবার সাম্প্রদায়িক সমস্যা মোকাবেলা করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। যেমন আর একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। স্বামী শ্রদ্ধানন্দের শুদ্ধি অভিযানকে কেন্দ্র করে বিশের দশকে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ভারতের বহু জায়গায় দাঙ্গা হয়। বিষয়টি গান্ধীজিকে খুবই আহত ও বিচলিত করে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, উভয় সম্প্রদায়ের পাপের প্রতিকার করতে তিনি নিজেই প্রায়শ্চিত্ত করবেন। তার সেই প্রায়শ্চিত্ত করার উদ্দেশ্য হিন্দু ও মুসলমান এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তার আগে তিনি সাম্প্রদায়িক হানাহানি বন্ধে আবেদন-নিবেদন করেন; কিন্তু কেউ তাতে কর্ণপাত করেনি। ১৯২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি ২১ দিনব্যাপী অনশন ব্রত পালনের ঘোষণা দেন। দুষ্কৃতকারীদের পাপের দায়দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন। অনশন ব্রত শুরু করার আগে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন :My penance is the prayer of a bleeding heart for forgiveness of sins unwillingly committed.. অর্থাৎ অনিচ্ছাকৃতভাবে যে পাপ সংঘটিত হয়েছে তা থেকে ক্ষমা ভিক্ষার জন্য এক রক্তাক্ত হৃদয়ের প্রার্থনাই আমার প্রায়শ্চিত্ত।

Loading...

No comments

Powered by Blogger.