হদলনারায়নপুরের ছোট মণ্ডল পরিবারের ৩০০ বছরের দুর্গাপুজো



বাঁকুড়া : বাঁকুড়ার পাত্রসায়র থানার নারায়নপুর পঞ্চায়েতের হদলনারায়নপুর ছোট মণ্ডল পরিবারের ৩০০ বছরের দুর্গাপুজো ।

বাঁকুড়া  জেলার  পাত্রসায়র  ব্লকের  অন্তর্গত  একটি  গ্রাম  হদল-নারায়ণপুর।  আসলে  গ্রামটি  নারায়ণপুর।  অন্য  নারায়ণপুরের  সঙ্গে  পার্থক্য  করার  জন্য  নারায়ণপুরের  পাশের  গ্রাম  হদলের  সঙ্গে  যোগ  করে  হদল-নারায়ণপুর  নামে  অভিহিত  করা  হয়। 

মণ্ডল  উপাধিধারী  ভূতপূর্ব  জমিদার-পরিবারের  তিন  তরফের  প্রতিষ্ঠিত  কয়েকটি  'টেরাকোটা'  মন্দির  ও  রাসমঞ্চ  প্রভৃতি  এখানকার  প্রধান  পুরাকীর্তি।  এ  পরিবারের  মুচিরাম  ঘোষ, মল্লরাজ  গোপাল  সিংহের  আমলে  ( ১৭২০-১৭৫২  খ্রীষ্টাব্দ ),  প্রাক্তন  নিবাস  নীলপুর  থেকে  উঠে  এসে  এখানে  বসতি  স্থাপন  করেন।  গোপাল  সিংহের  সভাসদ  ও  সংলগ্ন  গ্রাম  রামপুরের  অধিবাসী  শুভঙ্কর  দাস  তাঁকে  মল্ল-রাজদরবারে  পরিচয়  করিয়ে  দেন।  কিন্তু  নিজ  কৃতিত্বে  অল্পকালের  মধ্যেই  তিনি  এ  অঞ্চলের  প্রশাসক  নিযুক্ত  হন  এবং  'মণ্ডল'  উপাধি  লাভ  করেন।  পরে,  বিস্তীর্ণ  জমিদারির  অধিকারী  হন।  নীলের  কারবারেও  এই  পরিবার  প্রভূত  অর্থ  সঞ্চয়  করেন।  সেই  ঐশ্বর্যের  ফলশ্রুতি,  এখানকার  প্রধান  পুরাকীর্তিগুলি।  এখানে  আমি  ছোট  তরফের  প্রতিষ্ঠিত  নবরত্ন  ও  দামোদর  মন্দির  নিয়ে  লিখব।

গ্রামে  ঢুকে  ব্রহ্মানী  দেবীর  মন্দিরকে  বাঁ  দিকে  রেখে  উত্তরে  এগুলে  ডান  দিকে  পড়বে  মণ্ডলদের  ছোট  তরফের  ভদ্রাসন।  বাড়ির  প্রাঙ্গণে  মন্দির।  মন্দিরটি  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  স্থাপিত,  দক্ষিণমুখী  ও  নবরত্ন  শৈলীর।  এই  মন্দিরের  চেহারায়  যে  গির্জার  আদল  দেখা  যায়  তা  অভিনব।  সামনে  ত্রিখিলান  প্রবেশপথযুক্ত  অলিন্দ।  সামনে,  পূর্ব  ও  পশ্চিম  দিকে  'টেরাকোটা'-অলংকরণ  আছে।  'টেরাকোটা'র  বিষয় :  কৃষ্ণলীলা,  পৌরাণিক-সামাজিক  দৃশ্য  ও  ফুলকারি  সজ্জা।  মন্দিরের  সামনের  দিকের  মাঝের  খিলানশীর্ষে  অর্জুনের  লক্ষ্যভেদের  বড়  প্যানেলটি  খুবই  সুন্দর  ও  অভিনব।  পর  পর  ঘোড়া,  সওয়ার,  হাতি,  সিংহ  প্রভৃতি  বসানো  মৃত্যুলতা  দেওয়ালের  কোণে  বা  গায়ে  খাড়া  করে  লাগানোই  সর্বত্রপ্রচলিত  রীতি।  কিন্তু  এখানে  সেগুলি  প্রতি  কোণের  দু  পাশে  সমতলভাবে  নিবদ্ধ।  মন্দিরে  চার  সারি  বিভিন্ন  মুখের  ফলক  আছে  যা  অন্য  মন্দিরে  দেখা  যায়  না।  আর  আছে  বিভিন্ন  বাদ্যযন্ত্র  বাজনরত  বাজিয়ে।  মন্দিরে  কোন  প্রতিষ্ঠাফলক  নেই।  তবে  পারিবারিক  সূত্রানুসারে,  বাবুরাম  মণ্ডল  তাঁর  নাবালক  পুত্র  গঙ্গাপ্রসাদের  নামে  এ  মন্দির  প্রতিষ্ঠা  করেন।  প্রতিষ্ঠাকাল  খ্রীষ্টীয়  ১৯শ  শতাব্দীর  প্রথম  দিক।  মন্দিরটিতে  এখন  সংস্কারের  কাজ  হচ্ছে ।

ছোট মণ্ডল পরিবারের সদস্য হিমাঙ্ক শেখর মন্ডল বলেন ,  আমাদের পুজোর বিশেষ ঐতিহ্য হলো সপ্তমীর দিন নদী থেকে কলা বউ কে স্নান করিয়ে আনা হয় এবং সেই প্রাচীন রীতিনীতি মেনে আমরা আজও পুজোর ঐতিহ্যকে বজায় রেখেছি ।  বর্তমান রীতিনীতি বলতে তিনি বোঝান বিভিন্ন ধরনের লাইট দিয়েই বাড়িকে সাজানো হয় ।

শুধুমাত্র মন্ডল পরিবারই নয় ,  হদল নারায়নপুর গ্রামের প্রতিটি মানুষই ছোট মণ্ডল পরিবারের এই দুর্গাপূজা কে কেন্দ্র করে পুজোর কটা দিন আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠেন ।
Loading...

No comments

Powered by Blogger.