রাজ্যে সাত বছরে যা কাজ হয়েছে তাকে মিরাক্কেল ছাড়া কিছু বলা যায় না: মুখ্যমন্ত্রী



রাজা সেখ, নদীয়াঃ রাজ্যে সাত বছরে যা কাজ হয়েছে তাকে মিরাক্কেল ছাড়া কিছু বলা যায় না। বিগত সাত বছরে যা কাজ হয়েছে তাকে মিরাক্কেল ছাড়া কিছু বলা যায়না। বুধবার নদীয়ার হবিবপুরের ছাতিম তলার মাঠে প্রশাসনিক সভায় একথা বলেন, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নদীয়ার প্রশাসনিক কর্তাদের উপর ক্ষুদ্ধ হয়ে তিনি বলেন, রিপোর্ট পড়ে থাকছে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তার পরামর্শ কাজ ফেলে রাখবেন না। সময়ের কাজ সময়ে করুন। নাহলে আমি কিন্তু কাজের ব্যাপারে রাফ এন্ড টাফ। জেলার বিভিন্ন কর্তাদের মুখ্যমন্ত্রীর উপদেশ কাজে গতি বাড়াতে হবে। মানুষ কাজ চায়। গরিব মানুষরা বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা সঠিক সময়ে হাতে পায়ে সে বিষয়ে তিনি জেলার সমস্ত ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকদের দেখতে বলেন। জেলার সীমান্তবর্তি এলাকাগুলিতে কি ধরণের নজরদারী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা পুলিশ সুপার রূপেশ কুমারের কাছে জানতে চান মুখ্যমন্ত্রী।
পুলিশ সুপার বলেন, প্রতিটি সীমান্তে ওয়াচ টাওয়ার বসান হয়েছে। এদিন প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জেলার রাস্তা ঘাটগুলিকে চওড়া এবং পুরান সেতুগুলি কে সংস্কার করার উপরও জোর দেওয়ার নির্দেশ দেন। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক বেহাল অবস্থা প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী দায়ী করেন কেন্দ্র সরকার কে। তিনি বলেন, জাতীয় সড়কের দায়িত্ব কেন্দ্রের। জাতীয় সড়কের রাস্তাগুলির বেহাল অবস্থার কথা তাদের জানান হয়েছে। এবিষয়ে তিনি বলেন, মানুষের জানা দরকার জাতীয় সড়কটির দায়িত্ব কার। মুখ্যমন্ত্রী জানান, বড়জাগুলি থেকে কাঁপা মোড় পর্যন্ত সেতুর কাজ খুব শীঘ্রই শুরু করা হবে। এছাড়াও নবদ্বীপ, কল্যাণী, মুড়াগাছা সহ বেশ কিছু রাস্তার সংস্কারের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আধিকারিক। শান্তিপুর ও কালনার মধ্যে গঙ্গার উপর সেতুর কাজ কি অবস্থায় রয়েছে। সেবিষয়ে দপ্তরের সচিবের কাছে জানতে চান তিনি। সচিব বলেন, সেতুর কাজ শীঘ্রই শুরু হবে। নবদ্বীপ ও মায়াপুরের হেরিটেজের কাজ কত দূর সেবিষয়ে সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরের সচিবের কাছে জানতে চাইলে, দপ্তরের সচিব বলেন সার্ভের কাজ কিছুটা বাকি আছে। সচিবের এই  উত্তরে খুশি হননি মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এক বছরের উপর হল মায়াপুর নবদ্বীপ কে হেরিটেজ সিটি ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি দপ্তরের সচিব কে আমি কোনও কথা শুনতে চাইনা। মায়াপুর ও নবদ্বীপ হেরিটেজের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেন তিনি। এছাড়াও মায়াপুরে পর্যটকদের সুবিধার জন্য হেলিপ্যাড করার জমির কোনও সমস্যা হবে কিনা তাও জানতে চান মুখ্যমন্ত্রী। স্থানীয় মানুষদের কোনও অসুবিধা হবে কিনা তাও জানতে চান। এবিষয়ে জেলা শাসক ও নবদ্বীপ পৌরসভার পুরপিতা বিমান কৃষ্ণ সাহা তাকে জানান জমি নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মায়াপুরে হেলিপ্যাড তৈরি হলে প্রচুর কর্মসংস্থান হবে। সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে। জেলায় কত রিফিউজি কলোনী আছে তা জেলা শাসক সুমিত গুপ্তা কে তারও খোঁজ নিতে বলেন। নদীয়ার ঐতিহাসিক ক্ষেত্র পলাশীতে খুব শীঘ্রই পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। হরিনঘাটায় একটি ই' কমার্স সংস্থা গড়ে তোলা হবে। সেখানে প্রায় ১০ হাজার বেকার যুবক যুবতীর কর্মসংস্থান হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়াও নদীয়ায় সবরর্তীর্থ গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি। মাজদিয়ায় খেজুর গুড়ের আধুনিক প্যাকেজিং কারখানা গড়ে তোলার কথাও ঘোষণা করেন তিনি। এছাড়াও নদীয়ায় এক্সপোর্ট হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে বলে যস্নান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন প্রশাসনিক বৈঠকে কৃষকদের জন্য খাজনা মুকুব, ১৮ থেকে ৮০ বছরের কৃষকদের জন্য ২ লক্ষ টাকা বীমার কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। গুজরাট থেকে কেন হ্যান্ডলুম এরাজ্যে আসবে? তিনি বলেন, আমাদের তাঁতী সাথী প্রকল্প আছে। নদীয়াতে তাঁতী সাথী প্রকল্পের উপর জোর দেওয়ার কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। পোল্ট্রি ফার্ম এর বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে ডিমের প্রচুর চাহিদা আছে। সেই তুলনায় ডিমের যোগান কম। এর জন্য পোল্ট্রিফার্ম গড়ে তোলার উপর জোর দিতে বলেন সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরের কর্তাদের। তার পরামর্শ একাজে স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে দেওয়া যেতে পারে। নদীয়া চেম্বার অফ কমার্সের তরফে কয়েকটি প্রকল্পের বিষয়ে প্রশ্ন করলে মুখ্যমন্ত্রী তাদের বলেন, এরাজ্যে যত স্কিম আছে তা সারা পৃথিবীতেও নেই। শান্তিপুরের বিধায়ক অরিন্দম ভট্টাচার্য ও শান্তিপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান অজয় দের মধ্যে আকচা আকচির বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী কে করা অবস্থান নিতে দেখা যায়। তিনি দুজন কে সতর্ক করে বলেন, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া অবিলম্বে বন্ধ কর। মুখ্যমন্ত্রীর উপদেশ কেউ কিন্তু দলের উর্ধে নয়। কারওর জন্য দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এটা আমি বরদাস্ত করব না। আপনাদের ঝগড়া মানুষের কাছে কি বার্তা যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী জেলার প্রত্যেকটি বিধায়কদের কাছে জানতে চান তাদের এলাকায় কাজ করতে গিয়ে কোনও অসুবিধা হচ্ছে কিনা। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন বিধায়করা মানুষের সঙ্গে দরবার করেন কিনা। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তার কাছে সব খবর আছে কে কি করেন। নাকাশীপাড়ার বিধায়ক কল্লোল খাঁ তার এলাকায় কি কি কাজ হয়েছে সে বিষয়ে বলতে উঠলে,তাকে থামিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন যথেষ্ট হয়েছে। কল্লোল খাঁ লোকসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলতে গেলে, মুখ্যমন্ত্রী তাকে থামিয়ে বলেন এটা প্রসানিক বৈঠক। এখানে রাজনৈতিক কথা হবেনা। রাজনৈতিক বিষয় শুনব আগামী বৃহস্পতিবার কৃষ্ণনগরে। এছাড়াও নবদ্বীপের বিধায়ক পুন্ডরীকাক্ষ সাহার সুস্থতার বিষয়ে খোঁজ নেন মুখ্যমন্ত্রী। বিধায়কের প্রতি তার পরামর্শ এখন যেন সে পূর্ণ বিশ্রাম নেয়। হবিবপুরে প্রশাসনিক বৈঠক শুরু হয় বেলা দেড়টা নাগাদ। চলে প্রায় তিনটে পর্যন্ত। সভা চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী জন প্রতিনিধিদের কৃষ্ণনগরে চলে যেতে বলেন। হবিবপুরে প্রশাসনিক বৈঠক সেরে বেলা ৪ টা নাগাদ সার্কিট হাউসে পৌঁছান মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে দলের পঞ্চায়েত ও ব্লক স্তরের নেতাদের নিয়ে মিটিং করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জেলা রাজনৈতিক মহল সূত্রের খবর নদীয়ায় বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনে যে ভাবে বি জে পি তৃণমূলের ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলেছে তাতে চিন্তা বেড়েছে বই কমেনি মমতার। একদা তৃণমূলের সেকেন্ড ইন চিফ মুকুল রায় বি জে পির হয়ে যে ভাবে জেলা সফর করছেন, তাতে চিন্তা বেড়েছে দলের সুপ্রিমোর। অপদিকে জেলার ২২ টি ব্লকেই দলের মধ্যে যে ভাবে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বাড়ছে তার দিকে তাকিয়ে এই মিটিং বলে মত রাজনৈতিক মহলের। সূত্রের খবর এদিনের মিটিংয়ে প্রতিটি নেতাকে বিভেদ ভুলে আগামীতে একসঙ্গে চলার পরামর্শ দিলেন দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
Loading...
Powered by Blogger.