সরকারের সামনে জলাভূমি ভরাট:বিপন্ন পরিবেশ



অর্ক রায়, মালদা : জমি মাফিয়া দের অশুভ আঁতাতে বিপন্ন মালদা। প্রশাসনের একটা অংশের সহায়তায় কিছু রাজনৈতিক নেতাদের সাহায্যে শহরে একের পর এক জলাভূমি ভরাটের কারণে বিপন্ন পরিবেশ। অসহায় লক্ষ লক্ষ সাধারন মানুষ। কিছুদিন আগেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একটি প্রশাসনিক বৈঠকে জলাভূমি ভরাট বন্দের নির্দেশ জানিয়েছিলেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ যে মালদায় কোন প্রভাব ফেলেনি, তা শহরের চারপাশ ছাড়াও পুরাতন মালদা পৌরসভা এলাকার চারিদিকে ঘুরলেই পরিষ্কার।

স্থানীয় মানুষদের অভিযোগ, প্রশাসনের একটা অংশের মদতে রাজনৈতিক নেতাদের পকেট ভরাতে সক্রিয় জেলার জমি মাফিয়ারা। দিনের পর দিন প্রকাশ্যে, দিনের আলোতেই বেপরোয়াভাবে চলছে বড় বড় পুকুর ভরাটের কাজ। পরে সেই জায়গাতেই গড়ে উঠছে বহুতল, কোথাও বা শপিং মল। বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। এসবই হচ্ছে চোখের সামনে, প্রকাশ্য দিবালোকে, দেখছে সাধারণ মানুষ। কেবল দেখতে পাচ্ছেন না সেই সমস্ত আধিকারিক বা প্রশাসনিক কর্তারা যাদের এই বেআইনী কাজ বন্ধ করার কথা। আর এইসব এর মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চির পরিচিত সবুজ জলাভূমিতে ঘেরা ছোট্ট মালদা শহর। বিপন্ন হচ্ছে জীবন-জীবিকা।
এই মুহূর্তে মালদা শহরের বুকে, জেলার বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবন থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে বাগবাড়ি এলাকায় মডেল মাদ্রাসা ইংলিশ মিডিয়াম সংলগ্ন একটি জলাভূমি ভরাটের কাজ। প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছরের পুরনো, অন্তত ৩৫ বিঘা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই জলাভূমি গুলি এলাকার মানুষের বহুদিনের সুখ-দুঃখের সাক্ষী। বহু মৎস্যজীবীর জীবিকার সংস্থান ও বটে, কিন্তু চোখের সামনেই প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ টি ট্রাক্টরের ১০০ থেকে ১৫০ গাড়ি মাটি ফেলে ধীরে ধীরে বুঝিয়ে ফেলা হচ্ছে এই জলাভূমি । আর সেখানেই সরকারি আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গড়ে উঠছে জমি মাফিয়া দের স্বপ্নের সৌধ। গরীব অসহায় মানুষ এই ঘটনার সাক্ষী থাকলেও, জমি মাফিয়া দের হুমকি, মারধর আর প্রাণহানীর আশঙ্কায় মুখ খুলতে পারছেন না কেউই। এই জলাভূমি যাতে সঠিক ভাবে বন্ধ করা যায় তার জন্য জলাভূমির পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে জমি মাফিয়া দের একটি অস্থায়ী অফিস। যেখানে প্রায় সর্বক্ষণ পাহারায় রয়েছে ১০ থেকে ১৫ জন সমাজ বিরোধী। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি দের ও সেখানে প্রবেশ অধিকার নিষেধ। আর সাহস করে কোন সাংবাদিক সেই খবর করতে চাইলে প্রথমে রয়েছে প্রলোভনের হাতছানি, না মানলে হুমকি, এমনকি অফিসে ডেকে হেনস্থা,প্রাণে মেরে দেওয়ার কথা ও।
এ রকমই একটা আতঙ্কের পরিবেশের মধ্যে কেবলমাত্র পেশার তাগিদে এই আমরা হাজির বাগবাড়ি এলাকায়, আমাদের চোখের সামনে দিয়েই ক্রমাগত মাটি ভর্তি ট্র্যাক্টরের আনাগোনা, ধীরে ধীরে মাটি ফেলে বুঝিয়ে ফেলা হচ্ছে জলাভূমি। নজরদারির জন্য মোতায়েন জমি মাফিয়া দের অনুগামীরা। এর মধ্যেই লুকিয়ে ছবি তোলা, পরে স্থানীয় মানুষের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে, অধিকাংশ মানুষই মুখ খুলতে চাইলেন না। প্রায় সকলের মুখে চোখেই তখন আতঙ্ক। একটু ভেতরে যেতেই দেখা হল এলাকার বাসিন্দা যুগল সরকারের সাথে, জানালেন ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখে আসছেন এই পুকুর। বহু মানুষের প্রয়োজনীয়তা মেটানো ছাড়াও দু-একটি অগ্নিকাণ্ড মেটাতে সাহায্য করেছে এই পুকুরের জল। মৎস্যজীবীদের একটা বড় অংশই এই পুকুরের উপরে নির্ভরশীল। এত জানার পরও কেন আপনারা এই বেআইনি কাজের প্রতিবাদ করছেন না, উত্তর এলো,'আমাদের বেঁচে তো থাকতে হবে, এতদিন পর কোথায় যাব এলাকা ছেড়ে?'এরপর অন্য প্রশ্ন করার আগেই বস্তির ঝুপড়ির মধ্যে মিলিয়ে গেল যুগল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এলাকারই অন্য এক মহিলা রঞ্জিত মন্ডল এর খেদোক্তি 'আমরা গরীব মানুষ, কি করে প্রতিবাদ করব? কিছু বললেই আমাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, মুখ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। ছেলে মেয়ে নিয়ে আমাদের এই এলাকায় বাস তো করতে হবে বলুন।'
চিত্র ২, মালদা শহরের ইংরেজবাজার পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের মালঞ্চপল্লী এলাকা। যেখান দিয়ে বয়ে গেছে শহরের মূল নিকাশি নালা। অভিযোগ এই এলাকাতেই বিগত কয়েক বছরে সব থেকে বেশি জলাভূমি ভরাট করা হয়েছে। আর যা হয়েছে তা প্রশাসনের একটা অংশের মদত আর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সম্পত্তির পরিমাণ কয়েকশো গুণ বাড়িয়ে দিতেই অভিযোগ স্থানীয় মানুষদের। এখনো এই এলাকায় চলছে প্রায় ১০ বিঘা এলাকা জুড়ে জলাভূমি ভরাটের কাজ। আর যা চলছে প্রকাশ্যেই স্থানীয় কাউন্সিলর ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের মদতে। এমনটাই অভিযোগ। যদিও প্রথাগতভাবে কাউন্সিলর এবং রাজনৈতিক নেতারা তাদের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চক্রান্তের। তাহলে কিভাবে হচ্ছে দিনের পর দিন এই সমস্ত বেআইনি কাজ কর্ম ? কিছুটা ব্যাকফুটে গিয়ে এদের বক্তব্য, আমরা জানতে পারলেই ব্যবস্থা নি। কিন্তু সবাই যেটা দেখতে পাচ্ছে সেটা আপনারা দেখতে পাচ্ছেন না কেন? উত্তর নেই। পরে কিছুটা থেমে.....' সবই তো বোঝেন, আমাদের হাতে কি আর সব কিছু আছে?'
ঠিকই তো, এবারে আমরা হাজির, মালদা শহরের এক নম্বর নাগরিক ইংরেজবাজার পৌরসভা পৌর প্রধান তথা বিধায়ক নিহার রঞ্জন ঘোষ এর কাছে, এর আগেও বহুবার জলাভূমি ভরাট নিয়ে সংবাদ মাধ্যমের অভিযোগ গেছে তার কাছে, মিলেছে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও। কিন্তু বাস্তবে যে তার কোন ফল হয়নি তার সাক্ষী হাজার হাজার শহরবাসী। তবুও প্রশাসনিক কর্তা হিসেবে আমরা বাগবাড়ি এবং মালঞ্চ পল্লী জলাভূমি ভরাট নিয়ে নীহার বাবুর বক্তব্য জানতে চাইলাম, তিনি তো শুনেই অবাক। বললেন, 'তাই নাকি! আমি এখনই ব্যবস্থা নিচ্ছি, প্রশাসনকে বলবো। শহরে একের পর এক যেভাবে জলাভূমি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে তাতে কিন্তু বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে নিকাশি ব্যবস্থা। অল্প বৃষ্টিতেই বেহাল হচ্ছেন শহরবাসী। কোন অবস্থাতেই এসব মেনে নেওয়া হবে না।'
সত্যিই কি বন্ধ হবে এই অপচেষ্টা?জেলার সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশকে ধ্বংস করার চক্রান্ত? জানতে এবারে আমরা হাজির মালদার ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তর এর বিভিন্ন আধিকারিকদের কাছে। জানতে পারলাম ইতিমধ্যেই তাদের দপ্তরের কাছেও পৌঁছেছে অভিযোগ। ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও করেছেন আধিকারিকরা। কিন্তু তারপর ? মালদার বি এল এল আর ও দীপঙ্কর সাহার বক্তব্য,'আমরা অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও করা হয়েছে। গত ৪ঠা নভেম্বর শহরের বাগবাড়ি এলাকার ঘটনা জানানো হয়েছে প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তা এবং পুলিশ আধিকারিকদের ও।'কিন্তু তার পরেও কিভাবে চলছে এই বেআইনী কাজ ? কেন এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জলাভূমি ভরাট বিরোধী আইনে থানায় অভিযোগ করা হলো না বাজেয়াপ্ত হলো না কোন ট্রাক্টর ? জমির মালিকের বিরুদ্ধেও কেন এখনো পর্যন্ত নেয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা ?আধিকারিক এর বক্তব্য, আমরা খতিয়ে দেখছি, জমির মালিক কে? জমির চরিত্রই বাকি কি আছে । আইন মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
তবে প্রায় ১৫ দিন কেটে গেলেও কেন এই সমস্ত তথ্য জানতে পারল না ভূমি দপ্তর? বন্ধ হল না কেবলমাত্র কয়েক জন জমি মাফিয়া আর রাজনৈতিক নেতাদের স্বার্থে এই জেলার লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলার চক্রান্ত আর ধ্বংসলীলা ? তবে কি সর্ষের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ভূত ? এই প্রশ্নই কিন্তু এখন সাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
কেন ধীরে ধীরে মালদা জেলায় একের পর এক জলাভূমি বুঝিয়ে ফেলা হচ্ছে? কারা জড়িয়ে? প্রশাসনের কোথায় কোথায় গাফিলতি? কিভাবে রাতারাতি জলাভূমির চরিত্র বদলে সেটা ডাঙ্গা বা বাস্তু হয়ে যাচ্ছে ? এসবের উত্তর খুঁজতেই আগামী দিনেও চলবে আমাদের সত্যানুসন্ধান।
Powered by Blogger.